ওয়েবডেস্ক৷ ৩১ অক্টোবর
কেউ অঝোরে কাঁদছেন, কারও চোখ অশ্ৰুসজল৷ সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে কেউ শাপান্ত করছেন, ‘জুবিনকে যারা হত্যা করেছে, তাদের যেন মৃত্যু হোক৷’ কেউ আবার জুবিনের ন্যায়ের দাবি চাইছেন জোরালোভাবে৷ কিন্তু সিনেমার পৰ্দায় হলেও প্ৰাণের শিল্পীকে ‘জীবিত’ দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি কেউ৷ সকলের মনে হয়েছে, জুবিন কাছেই রয়েছেন৷
প্ৰকৃতিও যেন কাঁদছিল৷ শুক্রবার সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার৷ ‘রৈ রৈ বিনালে’র প্ৰদৰ্শনী শুরু হওয়ার আগে থেকেই বৃষ্টি৷ তাই বৃষ্টি দেখে অনেকে বলছেন, নিজের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে দেখে জুবিনদাই কাঁদছেন৷ কিন্তু সিনেমা রিলিজের দিনে বৃষ্টির সম্ভবত সঠিক মূল্যায়ন করেছেন পত্নী গরিমা শইকিয়া গৰ্গ৷ ‘রৈ রৈ বিনালে’ দেখে ছলছল চোখে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি ভালবাসতেন জুবিন৷ যে দিন নিয়ে আসা হয়েছিল সিঙ্গাপুর থেকে, সে দিনও বৃষ্টি হয়েছে৷ আজ সকালেও সিনেমা রিলিজের আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়৷ জুবিনের সঙ্গে প্ৰকৃতির সম্পৰ্ককে ফের তুলে ধরেছে৷’
গুয়াহাটির সিনেমা হলে প্ৰয়াত স্বামীকে ‘পাশে’ নিয়েই সিনেমা দেখেছেন তিনি৷ ‘কেলভিন’ সিনেমা হলে নিজের পাশের চেয়ার খালি রাখেন গরিমা৷ ফাঁকা চেয়ারের দু’দিকের চেয়ারে একদিকে পত্নী অন্য দিকে বোন পামি৷ সিনেমা দেখে জুবিনের স্বপূরণের কথা বলেছেন গরিমা৷ তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত সাহস করে রৈ রৈ বিনালে দেখতে এসেছি৷ জুবিনের স্বপ্ন ছিল এই সিনেমা৷ সিনেমার কাজ শেষ হয়েছে, রিলিজও হয়েছে৷ কিন্তু নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি তিনি৷’ এর চেয়ে বেদনার আর কী হতে পারে৷’
প্ৰাণের শিল্পীর শেষ সিনেমা ‘রৈ রৈ বিনালে’ এমনিতেই ঝড় তুলেছে জুবিন অনুরাগীদের মধ্যে৷ দেশে অনন্য রেকৰ্ডও গড়েছে৷ অসমিয়া ভাষার এক আঞ্চলিক সিনেমার শো শুরু হয়েছে ভোর ৪.২৫টায়! দেশে সিনেমার ইতিহাসে এই নজির সম্ভবত আর নেই৷ আগামী এক সপ্তাহ ধরে অসমের কোনও সিনেমা হলে একটি শোয়েরও টিকিট নেই৷ সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে৷ ভোর সাড়ে চারটা থেকে শুরু হয়েছে শো, চলছে গভীর রাত অবধি৷ উজান থেকে নিম্ন অসম সব স্থানের সিনেমা হলেই উপচে পড়া ভিড়৷
শুক্রবার কাকভোর থেকে অসমের সিনেমা হলে জুবিন অনুরাগীদের ভিড় জমে৷ মনে হচ্ছিল যেন দৈনিন্দিন কাজকৰ্ম ছেড়ে সবাই ছুটেছেন সিনেমা হলের দিকে৷ সিনেমায় জুবিনের কান্না, শেষ বারের মতো জীবিত দেখে প্ৰাণের শিল্পীকে কাছে পাওয়ার অনুভব হয়েছে প্ৰত্যেকের৷ তাই হাজার হাজার অনুরাগীর কাছে কাছে এটা শুধু একটি সিনেমা নয়, জুবিনের প্ৰতি শ্ৰদ্ধা এবং ভালোবাসার এক সম্মিলিত মুহূৰ্ত৷ যাঁর কণ্ঠস্বর প্ৰজন্মের পর প্ৰজন্মকে গানের সুতোয় বেঁধে রেখেছিল৷
মহানগরে ‘রৈ রৈ বিনালে’র প্ৰথম শো শুরু হয় ভোর ৪.২৫ মিনিটে বেলতলার ম্যাট্ৰিক্স সিনেমায়৷ অনুরাগীরা সেখানে ভোর হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে থেকেই লাইন দেন৷ অনেকে মোমবাতি, ধূপকাঠি, ফুল নিয়ে আসেন৷ জুবিনের স্মৃতিতে হলের ভিতরে একটি বিশেষ আসন খালি রাখা হয়৷ বাইরে যখন অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল, তখন একজন জুবিন অনুরাগীর মন্তব্য, ‘এটা বৃষ্টি নয়, জুবিনদা কাঁদছেন৷’ জুবিনকে পৰ্দায় দেখার সঙ্গে-সঙ্গে অনুরাগীরা হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্ৰকাশ করেন, আবার কেউ কেউ নীরবে চোখের জল ফেলেন৷
এক দৰ্শক বলেন, ‘যদিও তিনি চলে গেছেন, তবুও মনে হচ্ছে তিনি আজ আবার জীবিত, আমাদের মধ্যেই আছেন৷’ অসমের প্ৰতিটি সিনেমা হলে আজ শুধু একটি চলচ্চিত্ৰের মুক্তি হয়নি, বরং গর্ব, শোক এবং কৃতজ্ঞতায় ভরা একটি পৰ্বও ছিল এতে৷ ‘রৈ রৈ বিনালে’ আজ ঐক্যের প্ৰতীক হয়ে ওঠে, যেখানে প্ৰজন্মের পর প্ৰজন্ম ধরে ভক্তরা একত্ৰিত হয়েছিলেন এমন একজন মানুষকে ‘জীবিত’ দেখতে, যার সুর চিরকাল অসম এবং উত্তর পূৰ্বে প্ৰতিধ্বনিত হবে৷
