ওয়েবডেস্ক। ১৭ জুন
আমি তখন কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ দু’জন লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম কীসের জন্য এসেছেন? তারা বলল, পরশু রাত থেকে তাদের এক ভাইয়ের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আমি বললাম, এ কী বলেন! তারা (বাংলাদেশি দু্ষ্কৃতি) বলল, হ্যাঁ, কেউ একজন বলেছে কিন্নরখালে লাশ আছে। এজন্যই আমরা এসেছি। একথা বলেই আমাকে জাপটে ধরে। থেমে থেমে কথাগুলো বলছিলেন রঞ্জিত দাস।
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। মঙ্গলবার সকাল এগারোটায় কাছাড় জেলার কাটিগড়ার ভারত-বাংলা সীমান্তবর্তী চণ্ডীনগর দ্বিতীয় খণ্ড গ্রামের বাসিন্দা এই রঞ্জিত দাসকে বাংলাদেশি দু্ষ্কৃতিরা ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর সীমান্তের ওই এলাকায় দেখা দিয়েছিল উত্তেজনা। বিএসএফ, পুলিশ প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিক সহ ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন শিলচরের সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, কাটিগড়ার বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক জাকারিয়া আহমেদ। ভারতীয় ওই কৃষককে উদ্ধারের দাবিতে সীমান্তে জড়ো হয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন কয়েকশো লোক। দফায় দফায় চলে বৈঠক। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) সঙ্গে চলে আলোচনা। বিষয়টা দিসপুর পর্যন্ত গড়ায়। হস্তক্ষেপ করেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা। দিল্লির সঙ্গে কথা বলেন তিনি। প্রবল চাপে পড়ে ভারতীয় কৃষক রঞ্জিত দাসকে উদ্ধার করতে মাঠে নামে বাংলাদেশের পুলিশ এবং বিজিবি। এক বাড়ি থেকে অপহৃত রঞ্জিত দাসকে উদ্ধার করে রাতেই টুকরগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের হাতে তাঁকে সমঝে দেয় বিডিআর। সীমান্ত থেকে নিয়ে এসে কাছাড় জেলা প্রশাসনের কাছে তাঁকে হস্তান্তর করে বিএসএফ। অপহরণকারীদের মারের চোটে রঞ্জিত দাস জখম থাকায় তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে কাটিগড়ার মডেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পর হাসপাতালের চেয়ারে বসে যুগশঙ্খকে অপহরণকাণ্ডের বিস্তারিত জানিয়েছিলেন ওই কৃষক। ষাটোর্ধ রঞ্জিতবাবু জানান, তিনি যখন কাজে ব্যস্ত তখন হঠাৎ করে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় দু’জন লোক। এরপর আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, এখানে কেন এসেছ? তারা জানায়, পরশু রাত থেকে নাকি তারা তাদের এক ভাইকে খুঁজে পাচ্ছে না। এরপরই তারা জানায়, কেউ নাকি তাদের বলেছে কিন্নরখালে লাশ আছে। এরজন্য তারা এসেছে। একথা বলার পরই তাঁকে জাপটে ধরে তারা। রঞ্জিতবাবু জানান, টেনে হিঁচড়ে তাঁকে নৌকোয় তুলে দু্ষ্কৃতিরা। নিয়ে যায় ওপার বাংলায়। ওই সময় তাঁকে মারপিট করা হয়। নৌকায় সুরমা নদী পার করে গ্রামের (আমনসিদ) এক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়ির একটা কক্ষে তাঁকে বন্দি করে রাখলেও ওই কক্ষের বিছানাপত্র ভালই ছিল বলে জানান স্বদেশে ফিরে আসা কৃষক রঞ্জিতবাবু। ওই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর আর তাঁর সঙ্গে কোনও খারাপ আচরণ করা হয়নি। দেওয়া হয়েছিল খাবারও। কিন্তু তিনি খাবার খাননি। তবে চা আর ব্রেড খেয়েছেন বলে জানান। বলেন, আমাকে প্রথমে যে বাড়িতে রাখা হয়েছিল, একসময় ওই বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। তখন অবশ্য হল্লা-চিৎকার না করতে শাসানি দিয়েছে ওরা। ওখানকার পুলিশ আর বিজিবি তাঁর (রঞ্জিত) সন্ধানে অভিযান শুরু করার পর তাঁকে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। হাসপাতালের চেয়ারে বসে এসব কথা জানান বাংলাদেশি দু্ষ্কৃতিদের হাতে অপহৃত হয়ে ১১ ঘণ্টার মতো ওই দেশে কাটিয়ে ফিরে আসা রঞ্জিত দাস নিজেই। বললেন, বিজিবি তাঁকে উদ্ধার করে ভারতীয় বিএসএফের হাতে সমঝে দেওয়ার পর স্বদেশের মাটিতে পা দেওয়ার পর প্রাণ ফিরে পেয়েছেন তিনি। যুগশঙ্খের সঙ্গে আলাপচারিতার পর বাংলাদেশের ভূমিতে ১০/১১ ঘণ্টা বন্দি থেকে স্বদেশে ফেরা রঞ্জিতবাবুকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সীমান্তের ওই বাড়িতে নিয়ে যান প্রশাসনের লোকজন। পরিবারের কাছে সমঝে দিয়ে ফেরেন প্রশাসনের লোকজন। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষা রঞ্জিতবাবুর পরিবারে ফিরে আসে স্বস্তি। তবে রঞ্জিতবাবুকে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে বাংলাদেশি দু্ষ্কৃতিরা তাঁকে যা বলেছিল সেই কথাগুলো যেন অগোছালোই থেকে গেছে।
রাতে রঞ্জিতবাবুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর উপস্থিত হয়েছিলেন বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ। তিনি জানান, রঞ্জিত দাস উদ্ধারের নেপথ্যে মূল কারিগর মুখ্যমন্ত্রী ড: হিমন্তবিশ্ব শর্মা। বাংলাদেশি দু্ষ্কৃতিরা অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া ভারতীয় ওই চাষিকে উদ্ধারের জন্য বিএসএফের শীর্ষ কর্তা সহ দিল্লির সঙ্গে কথা বলেন। ফলে দিল্লির চাপে রঞ্জিতবাবুকে ফেরৎ পাঠাতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ। তাঁর কথায়, মুখ্যমন্ত্রী তো বটেই, বিএসএফ,পুলিশ,সাধারণ প্রশাসন সবাই এই ইস্যুতে বেশ খেটেছেন। সবাইকে ধন্যবাদও জানান বিধায়ক। পাশাপাশি সীমান্তে বসবাস করা লোকজনের সুরক্ষা বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

error: Content is protected !!