ওয়েবডেস্ক। ২৩ অক্টোবর
একই তেলে দিনের পর দিন ভাজা হচ্ছে চপ, সিঙাড়া, জিলাপি-সহ নানা ধরনের খাবার। রাস্তার পাশে খোলামেলা দোকানে ধুলোবালি উড়ছে, সেই ধুলো মিশছে খাবারে। কোথাও আবার ভাজাভুজির সামগ্রী দীর্ঘক্ষণ ঢেকে না রেখেই বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ খাদ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাইলাকান্দি জেলায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ সচেতন নাগরিকদের।
শহর ও জেলার বিভিন্ন এলাকার একাংশ মিষ্টির দোকান, চপ-সিঙাড়ার দোকান এবং রাস্তার পাশের খাবারের দোকানে খাদ্যের গুণমান ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ক্রমেই উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের ভূমিকা কোথায়? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চায়ের দোকান, মিষ্টির দোকান কিংবা রাস্তার পাশের ভাজাভুজির ঠেলাগাড়িতে ভিড় লেগেই থাকে। চপ, সিঙাড়া, বেগুনি, পেঁয়াজি, বড়া-সহ বিভিন্ন ধরনের তেলেভাজা খাবার বহু মানুষের প্রতিদিনের জলখাবারের অন্যতম ভরসা। স্কুল-কলেজের পড়ুয়া থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ, যাত্রী ও পথচলতি সাধারণ নাগরিক—অনেকেই এসব দোকান থেকে খাবার কিনে থাকেন। কিন্তু খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত তেলের গুণমান এবং দোকানগুলির পরিচ্ছন্নতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থাকলেও বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ, জেলার একাংশ মিষ্টির দোকান ও চপ-সিঙাড়ার দোকানে একই তেল বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ ভাজার কাজে ব্যবহৃত তেল যথাসময়ে পরিবর্তন করা হচ্ছে কি-না, তার কোনও দৃশ্যমান নজরদারি নেই বলেও দাবি সচেতন নাগরিকদের। তেল কালচে হয়ে যাওয়া, পোড়া গন্ধ বের হওয়া কিংবা তেলের স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার পরও সেই তেল দিয়ে খাবার ভাজার অভিযোগ রয়েছে। সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, রান্নার তেল বারবার উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করলে তার রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন ঘটতে পারে। দীর্ঘক্ষণ গরম করা এবং বারবার ব্যবহারের ফলে তেলে ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তেল অতিরিক্ত কালচে হয়ে যাওয়া, ধোঁয়া ওঠা, অস্বাভাবিক গন্ধ কিংবা ফেনা তৈরি হওয়ার মতো লক্ষণ তেলের গুণমান নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
কেন্দ্রীয় খাদ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ভাজার তেলের গুণমানের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন। ব্যবহৃত তেলে মোট পোলার যৌগের পরিমাণ ২৫ শতাংশের বেশি হলে সেই তেল খাদ্য প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। ফলে শুধু কতবার তেল ব্যবহার করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে নয়, তেলের প্রকৃত গুণমান যাচাই করেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অথচ হাইলাকান্দি জেলার বিভিন্ন খাবারের দোকানে ব্যবহৃত তেলের গুণমান পরীক্ষা করা হচ্ছে কি-না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সক্রিয়তা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিকদের একাংশ।
শুধু তেলের গুণমানই নয়, খাবার তৈরির পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ কম নয়। জেলার বিভিন্ন রাস্তার পাশে খোলা অবস্থায় চপ, সিঙাড়া, বড়া ও অন্যান্য ভাজাভুজি তৈরি এবং বিক্রি হতে দেখা যায়। যানবাহনের ধোঁয়া, রাস্তার ধুলোবালি ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ সহজেই খাবারের সংস্পর্শে আসতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রস্তুত খাবার দীর্ঘক্ষণ খোলা অবস্থায় রাখা হয়। খাবার তৈরির সরঞ্জাম, তেল রাখার পাত্র, বিক্রির জায়গা এবং কর্মীদের পরিচ্ছন্নতা যথাযথভাবে বজায় রাখা হচ্ছে কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মিষ্টির দোকান ও ভাজাভুজির দোকানে খাবার ঢেকে রাখা, পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করা, নিরাপদ জল কাজে লাগানো এবং রান্নার স্থান পরিচ্ছন্ন রাখার মতো প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একাংশ দোকানে এসব নিয়ম যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ সচেতন মহলের। বিশেষ করে রাস্তার পাশে অস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানগুলিতে নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তাঁরা। খাদ্য সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন বা লাইসেন্স থাকা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার তৈরি করা এবং খাদ্যের গুণমান বজায় রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে, নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করা, প্রয়োজনে খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব খাদ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের। সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, হাইলাকান্দি জেলার বিভিন্ন এলাকায় খাবারের দোকানগুলিতে নিয়মিত পরিদর্শন, তেলের নমুনা পরীক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতা যাচাইয়ের মতো পদক্ষেপের দৃশ্যমানতা কম। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে কোনও রকম গাফিলতি কাম্য নয়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের পাশাপাশি যাঁরা প্রতিদিন রাস্তার পাশের দোকান থেকে খাবার কিনে খান, তাঁদের নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ফলে খাবারের দাম বা স্বাদের পাশাপাশি তার গুণমান ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রস্তুতির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
এই পরিস্থিতিতে হাইলাকান্দি জেলার খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক ও খাদ্য পরিদর্শকদের কাছে সচেতন নাগরিকরা জেলার মিষ্টির দোকান, চপ-সিঙাড়া ও বড়ার দোকান-সহ বিভিন্ন খাবারের বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত পরিদর্শনের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে বারবার ব্যবহৃত ভাজার তেলের গুণমান পরীক্ষা, খাবার ঢেকে রাখা হচ্ছে কি-না, দোকানের পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকছে কি-না এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধন বা লাইসেন্স রয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখারও দাবি জানান তাঁরা।
