ওয়েবডেস্ক। ১৬ জুন
অসমের শিক্ষাক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব উৎসবের পরিবেশ বিরাজ করছে৷ কাছাড় জেলার উধারবন্দের সন্তান, মেধাবী ছাত্র অরিন্দম সী-এর হাত ধরে ভারতের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে এক গৌরবোজ্জ্বল রেকর্ড গড়ল অসম৷ দেশের সবচেয়ে কঠিন এবং মর্যাদাপূর্ণ গণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রবেশিকা পরীক্ষায় অরিন্দমের একচ্ছত্র আধিপত্য শুধু বরাক উপত্যকাকে নয়, সমগ্র অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতকে গর্বিত করেছে৷
সোমবার রাতে ঘোষিত ২০২৬ সালের ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (আইএসআই)-এর প্রবেশিকা পরীক্ষায় ওপেন ক্যাটাগরিতে সর্বভারতীয়স্তরে ৬ নম্বর র৵াঙ্ক অর্জন করেছে অরিন্দম৷ এর মাধ্যমে সে উত্তর-পূর্ব ভারতের টপার হওয়ারও অনন্য গৌরব অর্জন করেছে বিশিষ্ট সাংবাদিক উত্তম সী-র পুত্র অরিন্দম৷ কয়েকদিন আগে ২০২৬ সালের চেন্নাই ম্যাথমেটিক্যাল ইনস্টিটিউট (সিএমআই)-এর প্রবেশিকাতেও বাজিমাত করে সে৷ অসমের একমাত্র ছাত্র হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ সহ ভারতের সেরা ৩০ জনের তালিকায় নিজের নাম খোদাই করে নিয়েছে অরিন্দম৷
উল্লেখ্য, আইএসআই ও সিএমআই হল এমন দু’টি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সুযোগ পাওয়া যে কোনও শিক্ষার্থীর কাছে স্বপ্নের মত৷ অরিন্দম এই দুই কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য অজর্ন করেছে একসঙ্গে৷
অরিন্দম উধারবন্দের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও পড়াশোনার জন্য শিলচরে ভাড়া ঘরে থাকে৷ তার এই জাদুকরী সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক নিরলস ও নিভৃত পারিবারিক সাধনা৷ অরিন্দমের পিতা, বিশিষ্ট সাংবাদিক উত্তম কুমার সী বর্তমানে শিলচরের জনপ্রিয় দৈনিক ‘সাময়িক প্রসঙ্গ’ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন৷ আর ঘরের কোণে বসে নীরবে ছেলেকে আগলে রেখেছেন মা রুমি সী৷ মা-ই ছিলেন অরিন্দমের এই দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তি ও প্রেরণার উৎস৷ মায়ের নিখাদ একাগ্রতা আর বাবার পেশাদার জীবনের সততা ও অনুশাসনই অরিন্দমকে আজকের এই অনন্য সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে৷ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শিলচরের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ড. কালাম ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড এডুকেশনের ৬ বছরের নিবিড় গাইডেন্স৷
শুধু অলিম্পিয়াড বা প্রবেশিকাই নয়, প্রথাগত পড়াশোনায়ও অরিন্দম দেখিয়েছে তার অনন্য প্রতিভা৷ ২০২৪ সালে সিবিএসই বোর্ডের অধীনে কেভি এনআইটি শিলচর থেকে ৯৬.৬ শতাংশ নম্বর (গণিতে ৯৯) নিয়ে সে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়৷ এরপর ২০২৬ সালে অসম রাজ্য স্কুল শিক্ষা বোর্ডের অধীনে শিলচরের অধরচাঁদ স্কুল থেকে ৯২.৬ শতাংশ নম্বর (আইটিইএস-এ ৯৯ সহ রাজ্যে সর্বোচ্চ) নিয়ে উচ্চতর মাধ্যমিকে কৃতিত্বের সাক্ষর রাখে৷ এছাড়া এবারের জেইই মেইনস প্রবেশিকায় সে গণিত বিষয়ে চোখধাঁধানো ৯৯.৯৭ পার্সেন্টাইল স্কোর লাভ করে৷
গত চার বছর ধরে অরিন্দম ধারাবাহিকভাবে জাতীয়স্তরে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখছে৷ ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে জোন্যাল র৵াঙ্ক-৩১ পায়৷ ২০২৪ সালে আইওকিউএম-এ রিজিওনাল সার্টিফিকেট, আরএমওতে উত্তীর্ণ হয়ে ইনমো ২০২৫-এর যোগ্যতা অর্জন এবং অসম ম্যাথমেটিক্স অলিম্পিয়াড-এ রাজ্যে তৃতীয় স্থান দখল করে৷ এছাড়া ২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড ফাউন্ডেশন ম্যাথস-এ রাজ্যে প্রথম স্থান, আইএমও-তে জোনাল র৵াঙ্ক-২ এবং আইওকিউএম-এ রিজিওনাল সর্বোচ্চ স্কোর (৫৯) করে ইনমো ২০২৬-এর টিকিট লাভ করে৷ ২০২৬ সালেও আইএমও-তে জোন্যাল র৵াঙ্ক-৬ এবং আইওএম-এ স্টেট র৵াঙ্ক-১ লাভ করে৷
অরিন্দমের এই অবিশ্বাস্য সাফল্য বরাক উপত্যকার সামাজিক ও শিক্ষামহলে এক নতুন জোয়ার এনেছে৷
সাধারণ মানুষের মনে একটা সময় গণিত নিয়ে যে ভীতি বা অনীহা কাজ করত, তা আজ এক লহমায় কেটে গেছে৷ অভিভাবক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আড্ডার মূল বিষয় এখন— ‘কীভাবে গণিতকে ভালবেসে অরিন্দমের মত হওয়া যায়!’ আইআইটি গুয়াহাটির গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. অনুপম শইকিয়া নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘আইআইটি গুয়াহাটিতে আমাদের অলিম্পিয়াড ট্রেনিং ক্যাম্পে আমি অরিন্দমকে খুব কাছ থেকে দেখেছি৷ আইএসআই ও সিএমআই-এর মত প্রতিষ্ঠানে পড়া মানে বিশ্বমানের গবেষক হওয়ার দরজা খুলে যাওয়া৷ অরিন্দমের এই কৃতিত্ব এই অঞ্চলের শত শত তরুণ প্রতিভাকে গণিত চর্চায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করবে৷’
একই সুর শোনা গেছে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্রধান দেবাশিস শর্মার কণ্ঠেও৷ তিনি অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, ‘অরিন্দমের এই সাফল্য বরাক উপত্যকার জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত৷ এটি প্রমাণ করে যে সঠিক সুযোগ ও জেদ থাকলে মফস্বল থেকেও জাতীয়স্তরে রাজত্ব করা যায়৷ তার এই সাফল্য উপত্যকার নতুন প্রজন্মের বুকে গণিত নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাবে৷’ তিনি আরও বলেন, ‘বরাক উপত্যকার পূর্ববর্তী কৃতী ছাত্র পৃথ্বীরাজ দে, শুভদীপ রায় ও নির্ঝর নাথের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় আমি বিশেষভাবে আনন্দিত৷ গণিতের প্রতি তার নিষ্ঠা ও ভালবাসাই এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি৷’
কাছাড়ের বিশিষ্ট গণিত শিক্ষক প্রণয় পালও অরিন্দমের সাফল্যকে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করেছেন৷ তিনি বলেন, ‘আইএসআই ও সিএমআই ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম৷ এখানে শুধু নম্বরের ভিত্তিতে নয়, গভীর গাণিতিক চিন্তাশক্তি, যুক্তি ও প্রমাণভিত্তিক দক্ষতার মূল্যায়ন করা হয়৷ অরিন্দম প্রমাণ করেছে গণিতের প্রতি তার ভালবাসা কতটা গভীর৷ এই সাফল্য আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে৷’ তিনি আরও বলেন, ‘আইএসআই ও সিএমআই থেকে স্নাতক হওয়ার পর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়— এমআইটি, প্রিন্সটন, কেমব্রিজ সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়৷ একইসঙ্গে ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্ট ফিন্যান্স, অ্যাকাডেমিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতেও উজ্জ্বল কর্মজীবনের সম্ভাবনা থাকে৷’
অরিন্দম সিএমআই-এ ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ তার এই সাফল্যের পর বরাক উপত্যকার স্কুল-কলেজগুলিতে গণিত নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে৷ শিক্ষাবিদদের মতে, অরিন্দম শুধু নিজের জন্য নয়, সমগ্র অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে৷

error: Content is protected !!