ওয়েবডেস্ক। ২০ ফেব্রুয়ারি
১৪ ফেব্ৰুয়ারি বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য সংস্কৃতি সম্মেলন, কাছাড় শাখা আয়োজিত ‘এ মাসের নাটক’ শীৰ্ষক নাট্যানুষ্ঠানে বঙ্গ ভবনে মঞ্চস্থ হল প্ৰখ্যাত নাট্যকার আলবেয়ার কামু রচিত নাটক ‘ক্যালিগুলা’৷ প্ৰযোজনা শিলচর কালচারাল ইউনিট ও নিৰ্দেশনা শেখর দেবরায়৷ বলতে দ্বিধা নেই, ঐতিহাসিক চরিত্ৰ ক্যালিগুলাকে আমি কি সেরকমভাবে চিনি? ক্যালিগুলা চরিত্ৰটির সঙ্গে আমার পরিচিতিই বা কতটুকু ? দাৰ্শনিক, নাট্যকার আলবেয়ার কামুর রচনাগুলো কি কখনো পাঠ করেছি? ‘ক্যালিগুলা’ মঞ্চস্থ হচ্ছে জেনে অন্তৰ্জালের মাধ্যমে কামু-র রচনা ও ক্যালিগুলা নিয়ে আলোচনা পড়ে মনে হচ্ছে যেন সাগরে একবিন্দু জলসম৷ ১৯৪৫ সালে প্ৰথম প্ৰযোজনাকালীন সময়ে কামু লিখেছিলেন, ‘Caligula is faithless towards humanity in order to keep faith with himself. He consents to die, having learned that no man can save himself alone and that one cannot be free by working against mankind. But at least he will have rescued sum souls, including his own and that of his friend scipio, from the dreamless sleep of mediocrity’৷ যাই লিখুন কামু, ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পৰ্যন্ত যে হিংস্ৰ রক্তক্ষয়ী উন্মাদনা সারা পৃথিবীকে রক্তাক্ত করেছিল ফ্যাসিবাদ তারই এক রাজনৈতিক প্ৰতিফলন এই নাটক৷ ‘ক্যালিগুলা’ নাটক, যা অস্তিত্ববাদী দৰ্শনের এবং অযৌক্তিকতারও পরভিত্তি করে রচিত৷ এতে রোমান সম্ৰাট ক্যালিগুলার স্বৈরাচারী ও উন্মাদ রাজত্বকে ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহার, জীবনের অৰ্থহীনতা, মৃত্যু এবং চরম স্বাধীনতার অনুসন্ধানকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷ প্ৰেমিকা তথা বোন দ্ৰুসিলার মৃত্যুর পর, ক্যালিগুলা উপলব্ধি করে যে মানুষ সুখী নয় এবং পৃথিবী অযৌক্তিক৷ এই উপলব্ধি থেকে সে প্ৰথাগত নৈতিকতা ও সামাজিক নিয়ম ভেঙে ফেলে৷ ক্যালিগুলা পরম ক্ষমতার অধিকারী হয়েও অনুভব করে যে, মানুষের জীবনের কোনও অৰ্থ নেই৷ সে অত্যাচারী হয়ে ওঠে এবং ‘চাঁদ’ ধরার মতো অসম্ভব কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে, যা তার নিজের অস্তিত্বের একাকীত্ব ও শূন্যতাকে ফুটিয়ে তোলে৷ সে নিজেকে ঈশ্বর হিসেবে দাবি করে এবং হত্যা ও ধ্বংসের পথ বেছে নেয়৷ সে বিশ্বাস করে, ‘ক্ষমতা পেলেই মানুষ নিজের নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে’৷ ঈশ্বর হিসাবে নিজেকে প্ৰতিষ্ঠিত করতে চায়৷ ক্যালিগুলা কেবল একজন পাগল রাজা নয়, যে তার আত্ম-বিনাশী সত্তার মাধ্যমে সমাজ ও ক্ষমতার মুখোশ খুলে দেয়৷
কামুর ‘ক্যালিগুলা’ মূলত ক্ষমতার অপব্যবহারের এক সতৰ্কবাৰ্তা এবং জীবনের অৰ্থহীনতার মাঝে মানুষকে নতুন অৰ্থ খোঁজার তাগিদ দেয়৷ মানুষের বিশ্বাস, বিধাতার বিধান সবকিছুতেই ক্যালিগুলা প্ৰতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়৷ সুন্দর, শান্তি ও শ্বাশতভাবে বেঁচে থাকার বিপরীতে ক্যালিগুলা বেছে নেয় বিনাশ ও ধ্বংসের পথ৷ অনিবাৰ্যভাবেই ক্যালিগুলাকে মৃত্যুবরণ করতে হয় রাজ উপদেষ্টাদের হাতে৷ এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক চরিত্ৰ নয়, বরং এক চিরন্তন আত্মবিনাশী মানুষের রূপক৷ ২য় বিশ্বযুদ্ধ সময়কালীন আলবেয়ার কামু রচিত নাটক ‘ক্যালিগুলা’ বিশ্ব নাট্য সাহিত্যে এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে৷
এই নাটকটিকে অসাধারণ অভিনয় কুশলতায় ‘ক্যালিগুলা’ চরিত্ৰটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন মাধুৰ্য চৌধুরী৷ নবীন প্ৰজন্মের অভিনেতা হিসাবে মাধুৰ্যকে এই প্ৰযোজনায় শ্ৰেষ্ঠ প্ৰাপ্তি হিসাবে চিহ্নিত করা বোধহয় অতিশয়োক্তি হবে না৷ স্কিপিও চরিত্ৰে শুভাশীষ চৌধুরীর নিখুঁত অভিনয়, বাচনভঙ্গি ও বাচিকতায় প্ৰাণবন্ত৷ হেলিকনের ভূমিকায় নীলাক্ষ চৌধুরীর পরিষ্কার সংলাপ নিক্ষেপ মুগ্ধ করেছে৷ তবে গোঁজা হয়ে সংলাপ বলা একটু হলেও চোখে পড়েছে৷ লেবিডাস চরিত্ৰে শেখর দেবরায়কে খুবই স্বচ্ছন্দ মনে হয়েছে৷ চেরিয়ে চরিত্ৰে শান্তনু সেনগুপ্তর অভিনয় ও মঞ্চের ব্যবহার দুৰ্দান্ত৷ ক্যাসিওনিয়া-র ভূমিকায় অজপা ধর অনবদ্য৷ অজপা ধরকে আরও অনেক নাটকে অভিনয় করতে দেখেছি৷ এরমধ্যে ক্যাসিওনিয়া-র চরিত্ৰটি তিনি অত্যন্ত কুশলতায় দৰ্শকের সামনে তুলে ধরেছেন৷ ১ম সম্ভ্রান্ত, ২য় সম্ভ্রান্ত ও ৩য় সম্ভ্রান্ত যথাক্ৰমে বলরাম দে, শৈবাল গুপ্ত ও সুমিত দেবনাথ সাবলীল অভিনয় করেছেন৷ তবে সুমিত দেবনাথকে মঞ্চ ব্যবহারে আরও সজাগ থাকতে হবে৷ প্ৰথম কবি, দ্বিতীয় কবি, তৃতীয় কবি এবং চতুৰ্থ কবি যথাক্ৰমে দেবাশীষ চক্ৰবৰ্তী, আলোক ভট্টাচাৰ্য, প্ৰশান্ত ভট্টাচাৰ্য এবং শংকর চক্ৰবৰ্তীর অভিনয় অনবদ্যতা মুগ্ধ করেছে৷ বিশেষ করে দেবাশীষ চক্ৰবৰ্তীর সহাস্যমুখ যেন মঞ্চটিকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল। পূজা দেব স্ত্ৰী চরিত্ৰটিকে চরিত্ৰানুযায়ীই করেছেন৷ দ্ৰুসিলা-র ভূমিকায় সৃজনী দেব ভালো করেছেন৷ যদিও চরিত্ৰটি স্বল্প সময়ের জন্য তবুও ক্যালিগুলার সাথে নৃত্য ও আবেগাশ্ৰিত অভিনয় দৰ্শকদের মুগ্ধ করেছে৷ মেরিয়ের ভূমিকায় মনোজিৎ রাউত সেরকম দাগ কাটতে পারলেন না৷ রক্ষীর ভূমিকায় সুজিত সূত্ৰধর চরিত্ৰানুযায়ী করেছেন৷
আলোকসম্পাতে দেবজ্যোতি রায় অপূৰ্ব৷ আলো সহযোগিতায় ছিলেন দীপঙ্কর দে৷ মঞ্চসজ্জায় প্ৰতীকী রাজদরবার কক্ষ নাটকের সঙ্গে অৰ্থবহুল সজ্জায় সজ্জিত করেছেন নারায়ণ সরকার৷ দারুণ হয়েছে৷ রূপসজ্জায় স্বপন কর চরিত্ৰানুযায়ী সাজিয়েছেন৷ চরিত্ৰের সাজসজ্জা ও পোশাক পরিকল্পনায় অজপা ধরকে প্ৰশংসা করতেই হয়৷ পোশাকের ঔজ্জ্বল্য দৰ্শকদের মুগ্ধ করেছে৷ আবহ পরিকল্পনায় কানাইলাল দাস চমৎকার৷ আবহ প্ৰয়োগে স্বৰ্ণদীপ দেবকে আরও সাবধানতা মনে রাখতে হবে৷ কারণ, উচ্চ শব্দ প্ৰয়োগ দৰ্শকদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল৷ অনেক সময় শব্দের কারণে সংলাপ শুনতে বাধা পাচ্ছিল৷
মঞ্চে একসঙ্গে অনেক চরিত্ৰের সুশৃঙ্খল অবস্থান নিৰ্দেশক শেখর দেবরায়ের কৃতিত্ব৷ তবে মাঝে মাঝে শৃঙ্খলাকে ভেঙেছেন সুমিত দেবনাথ৷ তাকে আগামী প্ৰযোজনায় সাবধান থাকতে হবে৷ প্ৰযোজনাটি সুপরিকল্পিত বলেই ছোট ছোট বিষয়গুলি নজরে আসে৷ নিৰ্দেশকের প্ৰতি বলি, আরেকটু সম্পাদনার প্ৰয়োজন আছে বলে মনে করি৷ এছাড়া সবকিছুতেই চমৎকার নিৰ্দেশনার ছাপ পরিলক্ষিত হয়েছে৷
সবশেষে, আমরা আশা করব ক্যালিগুলার আগামী প্ৰযোজনাতে আরও প্ৰাসঙ্গিকতা খুঁজে পাব৷ ক্যালিগুলার ঔদ্ভব, তার ইশারা আজকের সময়ের উপযোগী করে বুঝে নিতে পারব৷ শেষকথা, আমরা কলকাতার নাটক নিয়ে হইচই করি৷ কিন্তু আমরা অৰ্থাৎ শিলচরের নাটকও যে কোনও অংশে কম নয় তা বুঝিয়ে দিলেন ক্যালিগুলার নিৰ্দেশক শেখর দেবরায়৷ জয় হোক বরাক উপত্যকার নাটকের৷

error: Content is protected !!