ওয়েবডেস্ক। ১০ জুন
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক সতর্কবার্তা দিল নরওয়ের গবেষণা সংস্থা পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ওসলো। তাদের সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত আশি বছরের মধ্যে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যত সংখ্যক রাষ্ট্রীয় সংঘাত চলছে, তার নজির অতীতে খুব কমই দেখা গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপছে গোটা মানব সভ্যতা।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া থেকে শুরু করে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পর্যন্ত একাধিক যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত একই সময়ে সক্রিয় রয়েছে। শুধু সংঘাতের সংখ্যা নয়, তার ব্যাপ্তি, স্থায়িত্ব এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাবও অতীতের বহু রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে আঞ্চলিক সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গিয়েছে। ফলে কোনও একটি অঞ্চলে শুরু হওয়া অস্থিরতা দ্রুত বৃহত্তর সংকটে পরিণত হচ্ছে এবং তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে অন্যত্রও।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির প্রভাব হ্রাস পাওয়া এবং বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে ঐকমত্যের অভাব বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ায় বহু দেশ এখন কূটনৈতিক পথের বদলে সামরিক শক্তি প্রয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিও যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে। তুলনামূলক কম ব্যয়ে চালানো যায় এমন ড্রোন হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন শক্তিধর দেশের হস্তক্ষেপ সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রেই যুদ্ধক্ষেত্রে এক দেশ সরাসরি লড়াই করলেও তার পিছনে অন্য কোনও শক্তিধর দেশের সমর্থন বা প্রভাব কাজ করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে। অতীতে যুদ্ধের প্রধান ক্ষয়ক্ষতি সীমাবদ্ধ থাকত সামরিক বাহিনীর মধ্যে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা। শহরকেন্দ্রিক যুদ্ধ, বিমান হামলা এবং অবরোধের কারণে বাড়ছে প্রাণহানি, পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ব্যাপক উদ্বাস্তু সংকট।
একাধিক যুদ্ধ একসঙ্গে চলার ফলে আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলির উপরও প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে। খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিভিন্ন সংস্থাকে। ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তে মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
নরওয়ের গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরোনো ধাঁচের শান্তিরক্ষা উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দ্রুত নতুন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতাই বিশ্বের নতুন বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে। সেই কারণেই বিশ্বশান্তি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে।

error: Content is protected !!