ওয়েবডেস্ক। ২১ অক্টোবর
বরাক উপত্যকা তথা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রথিতযশা কথাশিল্পী মিথিলেশ ভট্টাচার্য আর নেই। সোমবার রাত ১১টা ৪৫মিনিটে শিলচরের অদূরে শ্রীকোণার কল্যাণী হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ঊনআশি বছর। তাঁর স্ত্রী প্রণতি ভট্টাচার্য আগেই মারা গেছেন দীর্ঘ রোগ ভোগের পর। তারপর থেকেই তিনি একাকী, নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছিলেন। গত শুক্রবার পিত্তথলিতে সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মিথিলেশবাবু। ডাক্তার ধ্রুবজ্যোতি পালের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছিল তাঁর। এসময় তাঁর পরিচিত অনেক নবীন-প্রবীণ লিখিয়েরাই দেখতে যান অসুস্থ কথাশিল্পীকে। তবে সোমবার বিকেল থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। রাতে ডাক্তারদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রয়াত হন মিথিলেশবাবু। মৃত্যুকালে তাঁর শয্যাপাশে ছিলেন তাঁর ভাইপো সহ আরও কয়েকজন।
মঙ্গলবার ভোরের আলোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই অনেকে শ্মশান অভিমুখে রওনা হন। কিন্তু শেষ দেখা পাননি তাঁরা কেউই। বলতে গেলে একেবারে লোকচক্ষুর অন্তরালেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়ে গেল শক্তিশালী এই লেখকের।
মিথিলেশবাবুর জন্ম ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের সিলেটে। পরবর্তীতে দেশভাগের বলি হয়ে এপারে চলে আসতে হয় তাঁকে সপরিবারে। সে দুঃখ থেকে গেছে তাঁর আমৃত্যু আর সেটা প্রকাশ পেছে তাঁর বহু ছোটগল্পে। ১৯৬৭ সালে শ্যামলেন্দু চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘অনিশ’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর ছোটগল্প। এরপর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন শ’খানেক ছোটগল্প। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘কক্ষপথ’। তারপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে ‘চৈত্র পবনে’, ‘আত্মকথা’, ‘স্বপ্নপুরাণ’, ‘দেশভাগের গল্প’, ‘প্রান্তজনকথা’ নামের গল্প সংকলনগুলি। প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ ‘ভাঙা পথের রাঙা ধূলায়’।
দীর্ঘদিন তিনি সম্পাদনা করেছেন সাহিত্য পত্রিকা ‘পরম্পরা’। সর্বশেষ সংখ্যা ‘জীবনানন্দ দাশ: ১২৫ বত্সর পূর্তি বিশেষ সংখ্যা’ দারুণভাবে সমাদৃত হয়েছে পাঠকমহলে। জীবনানন্দীয় বোধ তাঁর মধ্যে কাজ করত ভীষণভাবে আর তাই তাঁর অনেক গল্পেই সে বোধ ধরা পড়েছে। তপোধীর ভট্টাচার্যের সঙ্গে যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন সাহিত্য পত্রিকা ‘শতক্রতু’। তাঁর মৃত্যুতে বরাক উপত্যকা, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা সহ ভারতবর্ষের অনেক জায়গার কবি-সাহিত্যিকরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
তাঁর মৃত্যু বাংলা কথাসাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে মত প্রকাশ করেছেন সবাই। এখানে উল্লেখ্য, মিথিলেশবাবুর বেশ কিছু ছোটগল্প ভারতবর্ষের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তাঁর সমসাময়িক ঘনিষ্ঠ সাহিত্যসেবক তথা বিশিষ্ট কবি ও কলমলেখক অতীন দাশ বলেছেন, তাঁদের তরুণ বয়সে শিলচরে ছিল কবিদের রমরমা। বহু তরুণ সে সময়ে কবিতা লিখে নাম করেছেন। এরই মধ্যে গল্পকার হিসেবে উঠে আসেন তিনজন তরুণ লেখক শ্যামলেন্দু চক্রবর্তী, শেখর দাশ এবং মিথিলেশ ভট্টাচার্য। জীবন সম্পর্কে তাঁর যে গভীর বোধ ছিল সেসবই তাঁর গল্পে উপজীব্য হয়েছে, তাঁকে অযথা কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়নি। অতীনবাবু এ-কথাও বলেন যে, মিথিলেশ ছিলেন অজাতশত্রু, কারও মুখ থেকেই তাঁর সম্পর্কে কখনও কোনও কটূক্তি শোনা যায়নি।
বিশিষ্ট অধ্যাপক তথা প্রাবন্ধিক উষারঞ্জন ভট্টাচার্যও গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, শুধু অসম বা উত্তর-পূর্বাঞ্চল নয়, সমগ্র বাংলাসাহিত্যেই মিথিলেশ ভট্টাচার্যের গল্পগুলি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শোকাহত কবি দিলীপকান্তি লস্কর বলেন, মিথিলেশ ভট্টাচার্য ছিলেন অন্তরে কবিতায় আগ্রহী। তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। আরেকটি কথা অনেকেই জানেন না যে, মিথিলেশ কবিতাও লিখতেন। আসলে তাঁর গদ্যশক্তির ভিতরে ছিল কবিতারই নির্মাণ।
প্রাবন্ধিক স্বপ্না ভট্টাচার্য এই আকস্মিক প্রয়াণে খুবই ভেঙে পড়েছেন। তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘এই পৃথিবীতে একজনই ছিলেন যিনি আমার নাম ধরে ডাকতেন। সেই একমাত্র মানুষটিও আজ আর নেই। আমার কাছে এটা হলো ভ্রাতৃবিয়োগ।’
তিনি আরও বলেন, ১৯৭৫ সাল থেকে মিথিলেশের উত্থানকাল তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছ থেকে। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন উপত্যকার এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর, যা গত ৫০ বছর ধরে একই থেকেছে, কখনও নিজের ঘরানা থেকে বিচ্যুত হননি।
তরুণ গল্পকার সত্যজিৎ নাথ মিথিলেশ ভট্টাচার্যের স্নেহচ্ছায়ায় লেখাচর্চা চালিয়ে গেছেন বহু বছর ধরে। শোকাহত সত্যজিৎ বলেন, তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করবার মতো মানুষের সংখ্যা এখন একেবারেই নেই, কিন্তু মিথিলেশ ভট্টাচার্য ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি সবসময় তরুণপ্রজন্মকে ভালো লেখার জন্য নানাভাবে উৎসাহিত করে গেছেন।
মিথিলেশ ভট্টাচার্যের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন। বরাক বঙ্গের সাধারণ সম্পাদক গৌতম প্রসাদ দত্ত এক শোকবার্তায় লিখেছেন- একে একে নিভছে দেউটি। গত বছর বরাকবঙ্গের দূরশিক্ষা কেন্দ্রের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেদিন বাংলা পড়ুয়াদের প্রতি তাঁর পরামর্শ সূচক বক্তব্য ছিল হৃদয়গ্রাহী ও উদ্দীপক। সম্মেলনের বহুমুখী কাজকর্মকে দরাজ প্রশংসা করে বলেছিলেন, সময়টা কঠিন, তাই সতর্ক পদচারণা উচিত হবে।

error: Content is protected !!